একসময় মানুষের ধারণা ছিল রাজহাঁস সবসময় সাদা রঙের হয়। অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত মানুষ বিশ্বের কোথাও কালো রাজহাঁস কেউ দেখেনি।
এ কারণেই মানুষের মনে গেঁথে ছিল কালো রঙের কোনো হাঁস নেই, সবই কাল্পনিক। এরপর অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবারের মতো কালো রাজহাঁসের দেখা মিলে। পাখি বিশেষজ্ঞরা তো অবাক কালো রঙের হাঁস দেখে!
হাজার বছর ধরে মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান এক মুহূর্তেই মিথ্যে হয়ে যায় যখন সত্যিই প্রথম কালো রাজহাঁসের দেখা মিলে। এবার তবে জেনে নিন ব্ল্যাক সোয়ান বা কালো হাঁস মানে কী যা আমরা জানি না কিন্তু সেটি আসলে আছে বা ঘটতে পারে। এই উদাহরণ থেকেই এসেছে ব্ল্যাক সোয়ান ইভেন্টের তত্ত্ব। খুব সহজ করে বলতে গেলে, সেসব ঘটনাকেই ব্ল্যাক সোয়ান বলে বর্ণনা করা হয়।
ব্ল্যাক সোয়ান তত্ত্বের জনক হলেন নাসিম নিকোলাস তালেব। তিনি বহু বছর কাজ করেছেন পুঁজিবাজারে। এরপর তিনি পেশা পরিবর্তন করে চলে যান একাডেমিক জগতে। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় তার বই দ্য ব্ল্যাক সোয়ান। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরের বছরেই বিশ্বের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিরাট ধস নামে। তখন থেকেই আলোচিত তার এই তত্ত্ব। এবার জেনে নিন ব্ল্যাক সোয়ান বলতে কী বুঝায়?
যেগুলো ঘটে খুবই আচমকা, কোন পূর্বাভাস ছাড়া। একেবারেই অকল্পনীয়। এসব ঘটনার ব্যাপ্তি এবং ভয়াবহতা গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। বিশ্ব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বদলের সূচনা করে এবং এসব ঘটনার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। নাসিম নিকোলাস তালেবের মতে, এসব ঘটনা ঘটার পর অনেক বিশেষজ্ঞরাই সেগুলোকে অবশ্যম্ভাবী বলে মত প্রকাশ করেন। তবে তাদের এই জ্ঞান আসলে ঘটনা পরবর্তী উপলব্ধি থেকে পাওয়া। ঘটনার অভিজ্ঞতা থেকে অর্জন করা। ইংরেজিতে যাকে বলে ইন হাইন্ডসাইট।
এবারের করোনাভাইরাস মহামারি নয় বরং এর আগেও বিশ্ব ইতিহাসে অনেক বিপর্যয় ঘটেছে। বিগত ৩০ বছরে সবচেয়ে বড় পাঁচটি ব্ল্যাক সোয়ান ঘটনার ক্ষেত্রেই এসব বৈশিষ্ট্য একেবারেই স্পষ্ট। ঘটনাগুলো হলো- সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গন, নাইন ইলেভেন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক ধস, আরব বসন্ত ও সর্বশেষ করোনাভাইরাস মহামারি।
এসব ঘটনা যখন ঘটেছে, তার আগে পর্যন্ত কেউ কল্পনা করতে পারেনি। ঠিক যেমন করোনাভাইরাস কেড়ে নিয়েছে লাখো প্রাণ। কোনো রকম প্রস্তুতি কিংবা প্রতিষেধক তৈরি আজো সম্ভব হয়নি। এই ঘটনাটিও কালো রাজহাঁস তত্ত্বের মধ্যে পড়ে। এবার জেনে নিন করোনাভাইরাসের সঙ্গে কালো রাজহাঁসের কী সম্পর্ক-
যে মহামারি এখন পৃথিবীকে অচল করে রেখেছে, সেটির ইতিহাস এখনো অজানা। করোনাভাইরাস মহামারির শুরুটা সবারই জানা, তবে এর শেষ কোথায়, কখন, কীভাবে হবে, সেটি এখনো অজানা। তারপরও নিকোলাস নাসিম তালেব করোনাভাইরাস মহামারির যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী করোনাভাইরাস মহামারি ব্ল্যাক সোয়ান ইভেন্টের সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ। চীন থেকে শুরু হওয়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিশ্বের সবকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
এতে এ পর্যন্ত আড়াই লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। গত জানুয়ারিতেও বিশ্ব চলছিল স্বাভাবিক গতিতে। সকাল হতেই সব দেশের নগরীর রাস্তায় গাড়ির ভিড়। মানুষ ছুটছিল কাজে। শিক্ষার্থীরা স্কুলে-কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাজারগুলো গমগম করছিল। রেস্টুরেন্ট-পানশালায় ঘনিষ্ঠ হয়ে বসা উচ্ছল মানুষের দল। ফুটবল স্টেডিয়ামে হাজারো সমর্থকের উল্লাস। বিপণি কেন্দ্রগুলোতে উজ্জ্বল আলোর নীচে ছিল ক্রেতা সমাগম।
তারপর অদৃশ্য ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লো মানুষ থেকে মানুষে। এক শহর থেকে আরেক শহরে, বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। সব কোলাহল মুহূর্তেই থেমে গেল। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন শহরগুলো যেন মৃত্যুপুরী। অনেক বিশেষজ্ঞই এখন বলার চেষ্টা করছেন এরকম একটা মহামারি হওয়ার আগাম ইঙ্গিত তারা পেয়েছেন। এমনকি তারা নাকি হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন। তবে যে যাই বলুক, প্রকৃত সত্য হলো ঘটনার পর তার থেকে বাস্তব ধারণা নিচ্ছে সবাই।
নাসিম নিকোলাস তালেবের কথায়, ব্ল্যাক সোয়ান ইভেন্টের পূর্বাভাস দেয়া খুবই কঠিন। আর এই ভাইরাসের খুবই ব্যাপক ও শক্তিশালী। এরকম ঘটনা আমাদের প্রত্যাশার বাইরে বলেই এভাবে ঘটার সুযোগ পায়। আর একারণেই ব্ল্যাক সোয়ান এক বিরাট ধাঁধাঁ।
সূত্র: বিবিসি

